কিছু কষ্ট আছে যা মুখে বলা যায় না, অথচ কোনো কবির দুই লাইনে হঠাৎ নিজের মনের কথা খুঁজে পাওয়া যায়। উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের অমর কবি মির্জা গালিব ঠিক এমনই একজন। প্রেমের বিরহ, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা, একাকিত্ব আর জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে তিনি এমন সহজ অথচ গভীর ভাষায় লিখেছেন যে দেড়শো বছরের বেশি সময় পরেও তাঁর শের মানুষের বুকের ব্যথা ছুঁয়ে যায়।
এই লেখায় মির্জা গালিবের কষ্ট, দুঃখ ও বিরহ নিয়ে সেরা ২০টি উক্তি (শের) বাংলা অর্থসহ তুলে ধরা হলো। প্রতিটি উক্তির সঙ্গে মূল উর্দু পঙ্ক্তির বাংলা উচ্চারণ এবং সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও দেওয়া আছে।
মির্জা গালিব কে ছিলেন?
মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান, যিনি ‘গালিব’ নামে পরিচিত, ১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মারা যান। তিনি ছিলেন মোগল যুগের শেষ দিকের কবি; শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারেও তাঁর বিশেষ সম্মান ছিল।
গালিবের ব্যক্তিগত জীবন ছিল কষ্টে ভরা। অল্প বয়সে বাবাকে হারান, তাঁর সাতটি সন্তানের কেউই শৈশব পেরিয়ে বাঁচেনি। সারা জীবন ঋণ আর আর্থিক টানাপোড়েনে কেটেছে, আর ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে চোখের সামনে দিল্লির ধ্বংস দেখেছেন। এই ব্যক্তিগত বেদনাই তাঁর শেরকে এত সত্য আর মর্মস্পর্শী করে তুলেছে।
মির্জা গালিবের কষ্টের উক্তি: বাংলা অর্থসহ সেরা ২০টি শের
১. অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার কষ্ট
হাজারো এমন আকাঙ্ক্ষা, যার প্রতিটির জন্যই প্রাণ বেরিয়ে যায়; আমার অনেক সাধই পূরণ হয়েছে, তবু যেন কমই হলো।
মির্জা গালিব
মূল: “হাজারোঁ খোয়াহিশেঁ অ্যায়সি কে হার খোয়াহিশ পে দম নিকলে, বহুত নিকলে মেরে আরমান লেকিন ফির ভি কম নিকলে।” মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নেই—গালিবের সবচেয়ে বিখ্যাত এই শেরটি সেই চিরন্তন অতৃপ্তির কথাই বলে।
২. ব্যথার ওষুধ কী
অবুঝ হৃদয়, তোর কী হলো? এই ব্যথার ওষুধ আসলে কী?
মির্জা গালিব
মূল: “দিল-এ-নাদাঁ তুঝে হুয়া কেয়া হ্যায়, আখির ইস দর্দ কি দাওয়া কেয়া হ্যায়।” নিজের মনকেই প্রশ্ন করছেন কবি—যে কষ্টের কারণ জানা, তবু উপশম জানা নেই।
৩. প্রেম যা কেড়ে নেয়
প্রেম গালিবকে অকেজো করে দিয়েছে, নইলে আমিও কাজের মানুষ ছিলাম।
মির্জা গালিব
মূল: “ইশক নে গালিব নিকম্মা কর দিয়া, ওয়ারনা হাম ভি আদমি থে কাম কে।” হালকা রসিকতার আড়ালে প্রেমে সর্বস্ব হারানোর গভীর বেদনা।
৪. মিলন না হওয়ার ভাগ্য
প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন আমার ভাগ্যে ছিল না; আরও বেঁচে থাকলেও এই অপেক্ষাই চলতে থাকত।
মির্জা গালিব
মূল: “ইয়ে না থি হামারি কিসমত কে উইসাল-এ-ইয়ার হোতা, আগর অওর জিতে রেহতে ইয়েহি ইন্তেজার হোতা।” বিরহের সবচেয়ে করুণ রূপ—যে অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।
৫. কোনো আশা নেই
কোনো আশাই আর পূরণ হয় না, কোনো পথই আর চোখে পড়ে না।
মির্জা গালিব
মূল: “কোই উম্মিদ বর নেহি আতি, কোই সুরত নজর নেহি আতি।” হতাশার মুহূর্তে মানুষের মনের অবস্থা এর চেয়ে সহজভাবে বলা কঠিন।
৬. নির্ঘুম রাত
মৃত্যুর জন্য তো একটি দিন নির্ধারিতই আছে; তবু সারা রাত ঘুম আসে না কেন?
মির্জা গালিব
মূল: “মওত কা এক দিন মুয়াইয়ান হ্যায়, নিন্দ কিউঁ রাত ভর নেহি আতি।” দুশ্চিন্তায় জেগে থাকা প্রতিটি মানুষের রাতের কথা।
৭. হাসি হারিয়ে যাওয়া
আগে নিজের হৃদয়ের দশা দেখে হাসি পেত, এখন কোনো কিছুতেই আর হাসি আসে না।
মির্জা গালিব
মূল: “আগে আতি থি হাল-এ-দিল পে হাঁসি, অব কিসি বাত পর নেহি আতি।” কষ্ট যখন সয়ে যায়, তখন হাসিও হারিয়ে যায়।
৮. দুঃখে অভ্যস্ত হওয়া
দুঃখে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মানুষের দুঃখ আর দুঃখ থাকে না; আমার ওপর এত কষ্ট নেমেছে যে সবকিছুই সহজ হয়ে গেছে।
মির্জা গালিব
মূল: “রঞ্জ সে খুগর হুয়া ইনসাঁ তো মিট জাতা হ্যায় রঞ্জ, মুশকিলেঁ মুঝ পর পড়ি ইতনি কে আসাঁ হো গয়িঁ।” অনেক কষ্ট পেরিয়ে আসা মানুষের অদ্ভুত শান্ত অবস্থা।
৯. প্রেমের আগুন
প্রেমের ওপর কারও জোর চলে না, গালিব; এ এমন এক আগুন, যা জ্বালাতে চাইলে জ্বলে না, আর নেভাতে চাইলে নেভে না।
মির্জা গালিব
মূল: “ইশক পর জোর নেহি, হ্যায় ইয়ে উও আতিশ গালিব, কে লাগায়ে না লাগে অওর বুঝায়ে না বনে।” ভালোবাসার অসহায়ত্ব নিয়ে লেখা সবচেয়ে প্রিয় শেরগুলোর একটি।
১০. সারতে না পারার কষ্ট
ব্যথা ওষুধের কাছে ঋণী হলো না; আমি সেরে উঠলাম না—তাতে মন্দও কিছু হলো না।
মির্জা গালিব
মূল: “দর্দ মিন্নত-কাশ-এ-দাওয়া না হুয়া, ম্যায় না আচ্ছা হুয়া, বুরা না হুয়া।” নিজের কষ্টকে মেনে নেওয়ার এক তিক্ত গর্ব।
১১. চোখের জলের রক্ত
শিরায় শিরায় ছুটে বেড়ানোকে আমি রক্ত বলি না; চোখ দিয়েই যদি না ঝরে, তবে সে আবার কিসের রক্ত?
মির্জা গালিব
মূল: “রগোঁ মেঁ দওড়তে ফিরনে কে হাম নেহি কায়েল, জব আঁখ হি সে না টপকা তো ফির লহু কেয়া হ্যায়।” যে কষ্ট চোখের জল হয়ে না নামে, কবির কাছে তা সত্যিকারের কষ্টই নয়।
১২. হৃদয় তো পাথর নয়
এ তো হৃদয়, পাথর বা ইট তো নয়—ব্যথায় ভরে উঠবে না কেন? হাজারবার কাঁদব; কেউ আমাকে কষ্ট দেবে কেন?
মির্জা গালিব
মূল: “দিল হি তো হ্যায় না সঙ্গ-ও-খিশত দর্দ সে ভর না আয়ে কিউঁ, রোয়েঙ্গে হাম হাজার বার কোই হামেঁ সতায়ে কিউঁ।” আঘাত পাওয়া মানুষের অভিমানী প্রশ্ন।
১৩. থাকার যন্ত্রণা
যখন কিছুই ছিল না, তখনও খোদা ছিলেন; কিছু না থাকলেও খোদাই থাকতেন। আমার এই ‘থাকা’-ই আমাকে ডুবিয়েছে—না থাকলে কী-ই বা হতো?
মির্জা গালিব
মূল: “না থা কুছ তো খুদা থা, কুছ না হোতা তো খুদা হোতা, ডুবোয়া মুঝ কো হোনে নে, না হোতা ম্যায় তো কেয়া হোতা।” অস্তিত্বের বেদনা নিয়ে গালিবের দার্শনিক শের।
১৪. জীবন আর দুঃখের বাঁধন
জীবনের কারাগার আর দুঃখের বাঁধন আসলে একই জিনিস; মৃত্যুর আগে মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি পাবে কেন?
মির্জা গালিব
মূল: “কয়েদ-এ-হায়াত ও বন্দ-এ-গম অসল মেঁ দোনোঁ এক হ্যায়, মওত সে পেহলে আদমি গম সে নাজাত পায়ে কিউঁ।” বেঁচে থাকা মানেই কিছু না কিছু কষ্ট বয়ে বেড়ানো।
১৫. মুখের হাসি, ভেতরের অসুখ
তাকে দেখলেই আমার মুখে যে উজ্জ্বলতা ফোটে, তা দেখে সে ভাবে রোগীর অবস্থা বুঝি ভালোই আছে।
মির্জা গালিব
মূল: “উনকে দেখে সে জো আ জাতি হ্যায় মুহ পর রওনক, উও সমঝতে হ্যায় কে বিমার কা হাল আচ্ছা হ্যায়।” প্রিয়জনের সামনে কষ্ট লুকিয়ে রাখার চিরচেনা গল্প।
১৬. ব্যথাই যখন ওষুধ
এক ফোঁটা জলের আনন্দ নদীতে মিশে বিলীন হয়ে যাওয়ায়; ব্যথা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সে নিজেই ওষুধ হয়ে ওঠে।
মির্জা গালিব
মূল: “ইশরত-এ-কতরা হ্যায় দরিয়া মেঁ ফানা হো জানা, দর্দ কা হদ সে গুজরনা হ্যায় দাওয়া হো জানা।” চরম কষ্ট পেরিয়ে আসা শান্তির কথা।
১৭. দেরিতে পৌঁছানো খবর
মানলাম, তুমি অবহেলা করবে না; কিন্তু তোমার কাছে খবর পৌঁছানোর আগেই আমি ধুলোয় মিশে যাব।
মির্জা গালিব
মূল: “হাম নে মানা কে তগাফুল না করোগে লেকিন, খাক হো জায়েঙ্গে হাম তুম কো খবর হোনে তক।” অপেক্ষা করতে করতে ফুরিয়ে যাওয়ার বেদনা।
১৮. ছাইয়ের মধ্যে খোঁজ
যেখানে শরীর পুড়েছে, সেখানে হৃদয়ও নিশ্চয়ই পুড়ে গেছে; এখন ছাই খুঁড়ে আর কী খুঁজছ?
মির্জা গালিব
মূল: “জলা হ্যায় জিসম জাহাঁ দিল ভি জল গয়া হোগা, কুরেদতে হো জো অব রাখ জুস্তজু কেয়া হ্যায়।” সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর খোঁজ নিতে আসা মানুষের প্রতি অভিমান।
১৯. আধটানা তীরের ব্যথা
তোমার আধটানা তীরের কথা আমার হৃদয়কে জিজ্ঞেস করো; বুক ভেদ করে চলে গেলে এই খচখচে ব্যথা কোথা থেকে আসত?
মির্জা গালিব
মূল: “কোই মেরে দিল সে পুছে তেরে তীর-এ-নিম-কাশ কো, ইয়ে খলিশ কাহাঁ সে হোতি জো জিগর কে পার হোতা।” অসম্পূর্ণ সম্পর্কের অস্বস্তিকর, দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট।
২০. জান্নাতের সান্ত্বনা
জান্নাতের আসল সত্যি আমরা জানি, তবু মন ভালো রাখতে, গালিব, এই ভাবনাটা মন্দ নয়।
মির্জা গালিব
মূল: “হাম কো মালুম হ্যায় জন্নত কি হকিকত লেকিন, দিল কে খুশ রাখনে কো গালিব ইয়ে খয়াল আচ্ছা হ্যায়।” কষ্টের মাঝেও নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার গালিবীয় রসবোধ।
গালিবের কষ্টের উক্তি কেন এত জনপ্রিয়
গালিবের শেরের সৌন্দর্য হলো, তিনি কষ্টকে কখনো নাটকীয় করে তোলেননি। কখনো রসিকতা, কখনো প্রশ্ন, কখনো দার্শনিক ভাবনা দিয়ে তিনি দুঃখের কথা বলেছেন। তাই ভাঙা মনের মানুষ, প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা কেউ কিংবা জীবনের ভারে ক্লান্ত যেকোনো মানুষ তাঁর দুই লাইনে নিজেকে খুঁজে পান। ফেসবুক স্ট্যাটাস, হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস বা ডায়েরির পাতায় গালিবের উক্তি আজও সমান প্রিয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মির্জা গালিবের সবচেয়ে বিখ্যাত শের কোনটি?
“হাজারোঁ খোয়াহিশেঁ অ্যায়সি কে হার খোয়াহিশ পে দম নিকলে” শেরটি গালিবের সবচেয়ে বিখ্যাত ও সর্বাধিক উদ্ধৃত পঙ্ক্তি হিসেবে পরিচিত।
মির্জা গালিব কোন ভাষায় লিখতেন?
গালিব মূলত উর্দু ও ফারসি ভাষায় লিখতেন। উর্দু গজলের জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেলেও নিজে ফারসি রচনাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এখানে দেওয়া বাংলা অর্থ মূল উর্দু শেরের ভাবানুবাদ।
কষ্টের সময় গালিবের কোন উক্তিটি পড়া যায়?
দুঃখে ভেঙে পড়লে “দুঃখে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মানুষের দুঃখ আর দুঃখ থাকে না” এবং “ব্যথা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সে নিজেই ওষুধ হয়ে ওঠে”—এই দুটি শের মনে সাহস জোগায়।
মনের কষ্ট দীর্ঘদিন ধরে থাকলে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন বা প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিন—একা বয়ে বেড়ানোর দরকার নেই।
আরও পড়ুন: ভালোবাসা নিয়ে উক্তি, জীবন নিয়ে উক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি এবং সব মনীষীর উক্তি।

Leave a Reply